বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে মোটরসাইকেলের ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, যানজট, গণপরিবহনের অপ্রতুলতা এবং ধীরগতি। এছাড়াও, বাংলাদেশে মোটরসাইক্লিং কালচার এখন যথেষ্ট বিকশিত। যার ফলে মোটরসাইকেল রাইডারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে মোটরসাইকেল রাইডারদের এই দ্রুত বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশের মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সিং সিস্টেম মোটেও আধুনিকীকরণ করা হয়নি এবং বর্তমান ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং সিস্টেম এবং স্ট্যান্ডার্ডের অনেক বাইরে। সুতরাং, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণ করে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ প্রয়োজন, এবং এটি নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।


আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সিং সিস্টেম
আধুনিক বিশ্বের উন্নত এবং অনেক অনুন্নত দেশেও মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সিং সিস্টেমকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে একটি কাঠামোগত দক্ষতা-উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে সাধারণত, মোটরসাইকেল লাইসেন্স কেবল মাত্র একটি সাধারণ ক্যাটাগরীতে দেওয়া হয় না। বরং রাইডারের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, ও মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনক্ষমতার উপর ভিত্তি করে একাধিক ক্যাটাগরীতে নির্দিষ্ট মেয়াদে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়।
এটি আক্ষরিক অর্থেই চালকদের দক্ষতা, সচেতনতা বিকাশ, এবং রোড সেফটি আরো উন্নত করতে ফলপ্রসূভাবে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী প্রায় সব দেশই এটি স্বীকার করে যে, ১০০-১২৫ সিসির কমিউটার মোটরসাইকেল চালানো আর বেশি ইঞ্জিনক্ষমতার বড় মোটরসাইকেল চালানো যথেষ্ট ভিন্ন একটি বিষয়। তাই তারা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন সাইজ ও রাইডারদের রাইডিং অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা ক্যাটাগরীতে লাইসেন্স প্রদান করে।
সেখানে নতুন মোটরসাইকেল রাইডারদের বাধ্যতামূলকভাবে ছোট ও কম ক্ষমতার মোটরসাইকেল দিয়েই রাইডিং শুরু করতে হয়। পরবর্তীতে তাদের রাইডিং দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট সময়কালের রাইডিং অভিজ্ঞতা অর্জনের পরেই উচ্চতর ক্যাটগরীর লাইসেন্স পাবার জন্য বিবেচনা করা হয়। ফলে উন্নত দেশগুলিতে তারা নবিশ, হালকা, মাঝারি, এবং আন-রেস্ট্রিকটেড প্রভৃতি ক্যাটাগরীতে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে থাকে।


বাংলাদেশে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সিং সিস্টেম আধুনিকীকরণ - কিভাবে হতে পারে?
বাংলাদেশে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সিং সিস্টেম এখনও সেই পুরানো প্রচলিত পদ্ধতিতে রয়ে গেছে। ফলে এদেশের বাস্তব অবস্থা বেশ নাজুক। তাই আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আধুনিক সিস্টেমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ লাইসেন্সিং সিস্টেম ডিজাইন করা উচিত। বাংলাদেশে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের মূলত: সরাসরি আন্তর্জাতিক ডিজাইন বা কিছুটা পরিবর্তীত কিন্তু আধুনিক সিস্টেম গ্রহণ করা উচিত।
তবে আমাদের মোটরসাইকেল রাইডারদেরও প্রথমে কম-ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল দিয়ে রাইডিং শুরু করানো উচিত। তারপর নির্দিষ্ট সময়ের অভিজ্ঞতা অর্জন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের ডিজাইনকৃত সিস্টেমে তাদের দক্ষতা যাচাইয়ের পরই হাইয়ার ক্যাটাগরীর লাইসেন্সের জন্য তাদের বিবেচনা করা উচিৎ।
আর আধুনিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফিচার হলো রাইডারদের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার সময় এবং প্র্যাকটিক্যাল টেস্টে অংশগ্রহণের আগে কাঠামোগত ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা। বিশ্বের অনেক দেশে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স এ্যাপ্লিক্যান্টদের অনুমোদিত রাইডিং ট্রেইনিং স্কুল থেকে কিছু প্রত্যয়িত থিউরিটিক্যাল ও প্র্যাকটিক্যাল ট্রেইনিং প্রোগ্রাম সম্পন্ন করতে হয়।
এই প্রোগ্রাম গুলিতে রাইডারদের স্ট্যান্ডার্ড ট্র্যাফিক রেগুলেশন, রোড সাইন, বিপজ্জনক পরিস্থিতি অনুধাবন, প্রতিরক্ষামূলক রাইডিং কৌশল এবং সেফটি গিয়ার ব্যবহারের গুরুত্ব, ইত্যাদি শেখানো হয়। আর প্র্যাকটিক্যাল ট্রেইনিং অংশে বাইকের ব্যালান্স, কন্ট্রোল, কর্নারিং, এফিশিয়েন্ট ও ইমার্জেন্সি ব্রেকিং ইত্যাদির উপর জোর দেওয়া হয়। সুতরাং, বাংলাদেশেও মোটরসাইকেল রাইডারদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করার আগে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ গ্রহন ব্যবস্থা চালু করা দরকার।
এই সেগমেন্টে কেবল "পরীক্ষায় উত্তীর্ণ" হওয়ার পরিবর্তে, বাস্তব পরিস্থিতিতে কিভাবে নিরাপদে মোটরসাইকেল চালাতে হয়, এবং অন্যের ও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, তা শেখার উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আর রাইডাররা স্ট্যান্ডার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে এবং আরও শক্তিশালী মোটরসাইকেল এবং পরবর্তী স্তরের লাইসেন্সের জন্য এগিয়ে যাওয়ার আগে যথেষ্ট বাস্তব রাইডিং এক্সপেরিয়েন্স অর্জন করবে, এটি নিশ্চিতে সাহায্য করবে।
সেইসাথে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত লাইসেন্সিং সিস্টেমের প্রেক্ষিতে এমন সিস্টেম করা যেতে পারে, যাতে আমাদের মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স এ্যপ্লিক্যান্টরা তাদের আবেদনের প্রথম ধাপে পূর্ণ সুবিধাপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ লাইসেন্স পাবেন না, বরং তারা ধাপে ধাপে পরবর্তী উচ্চ স্তরের লাইসেন্স পাবেন। আর নতুন রাইডারদের সীমিত ইঞ্জিনক্ষমতা, প্যাসেঞ্জার বহনে নিষেধাজ্ঞা, এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য কিছু লিমিটেশন দিয়ে শুধুমাত্র একটি শিক্ষানবিস বা অস্থায়ী লাইসেন্স দেওয়া হবে।
শিক্ষানবিস বা অস্থায়ী লাইসেন্সধারীরা গুরুতর ট্র্যাফিক রেগুলেশন লঙ্ঘন ছাড়াই নির্দিষ্ট প্রবেশনকাল সম্পন্ন করার পরে এবং পর্যাপ্ত রাইডিং অভিজ্ঞতা অর্জন করার পরে, পরবর্তী স্তরের লাইসেন্সের জন্য আবেদন বা চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে, এই প্রক্রিয়াটি নতুন রাইডারদের তাদের দক্ষতার কমতি ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকরীভাবে সাহায্য করবে। আর সেইসাথে নতুন রাইডারদের শুরু থেকেই দায়িত্বশীল রাইডিং বিহেভিয়র অর্জনে সহায়ক হবে।
আর ক্যাটাগরী ভিত্তিক লাইসেন্সিং সিস্টেমের সাথে সাথে লাইসেন্স রিনিউয়াল ও পিরিয়ডিক এ্যাসেসমেন্টও আধুনিক ড্রাইভিং লাইসেন্সিং ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের অনেক দেশেই নির্দিষ্ট সময় বা বছর পরে বিশেষ কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করে নিতে হয়। আর এর সাথে থাকে কিছু রিফ্রেশার ট্রেইনিং কোর্স, বা কিছু বেসিক এক্সপার্টাইজ এ্যাসেসমেন্ট প্রগ্রাম; যাতে পুরাতন বা বয়স্ক রাইডাররা বর্তমান ট্র্যাফিক আইন এবং সেফটি ম্যানার সম্পর্কে আরো আপডেট হতে পারেন।
তো এই হলো বিশ্বব্যাপী প্রচলিত মোটামুটিভাবে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সিং ব্যবস্থার বেসিক ফর্মেশন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা। আমরাও বাংলাদেশে এভাবে ক্যাটগরি লাইসেন্সিং সিস্টেম অনুসরণ করতে পারি। এছাড়াও সেইসাথে ডিজিটাল আবেদন প্রক্রিয়া, কার্যকর পরীক্ষা পদ্ধতি এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংযোজনও অপরিহার্য। আর এর ফলেই বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ক্রেডিবল মোটরসাইক্লিং কালচার গড়ে ওঠা নিশ্চিত হবে; ধন্যবাদ।




























Discussion 8 Comments