বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্পে নতুন এক আলোচনা শুরু হয়েছে। কোভ মোটো বাংলাদেশ শুধু মোটরসাইকেল বিক্রি নয়, বরং আরও বড় একটি লক্ষ্য নিয়ে কথা বলছে বাংলাদেশকে উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার।


কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড কেন বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাইক রপ্তানির কথা ভাবছে?
বাংলাদেশের বাজারকে শুধু বিক্রির বাজার হিসেবে দেখছে না KOVE MOTO
সম্প্রতি কোভ মোটো বাংলাদেশের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা চিরদীপ বসু জানিয়েছেন, শুরু থেকেই তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল বাংলাদেশে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা। দীর্ঘমেয়াদে তারা বাংলাদেশকে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলের জন্য উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায়।
একটি নতুন ব্র্যান্ডের জন্য এমন ঘোষণা কেবল প্রচারণা মনে হতে পারে। তবে কোভের বৈশ্বিক কর্মকাণ্ড দেখলে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা যায়।

কোভ মোটরসাইকেল ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করলেও ব্র্যান্ডটি ডাকার র্যালি, ওয়ার্ল্ড সুপারবাইক চ্যাম্পিয়নশিপ এবং আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেল মার্কেটে দ্রুত নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছে।
কেন বাংলাদেশ?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, চীনভিত্তিক একটি কোম্পানি কেন উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে বিবেচনা করবে?
প্রথমত, বাংলাদেশের শ্রম ব্যয় এখনও অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কম। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। তৃতীয়ত, স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে বাংলাদেশ সরকার গত কয়েক বছর ধরে নীতিগত সুবিধা দিয়ে আসছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বাংলাদেশে ইতিমধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বলি ও উৎপাদন করছে। ফলে নতুন কোনো নির্মাতার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির কাজ আগের তুলনায় অনেক সহজ।
সুযোগ কেমন?
বাংলাদেশে বর্তমানে ২৫০-৩৫০ সিসি এবং তার উপরের পারফরম্যান্স সেগমেন্ট দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে অধিকাংশ ক্রেতার প্রধান বিবেচনা ছিল মাইলেজ, এখন অনেক রাইডার পারফরম্যান্স, প্রযুক্তি, হ্যান্ডলিং এবং রাইডিং এক্সপেরিয়েন্সকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই পরিবর্তন কভের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে।
যদি কোম্পানিটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু করতে পারে এবং পর্যাপ্ত ভলিউম অর্জন করতে পারে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার উদীয়মান বাজারগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে মোটরসাইকেল রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে KOVE এর 250RR, 350RR, 450RR বা অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের মডেলগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে পরিচিতি অর্জন করেছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে এখনও অনেক পথ বাকি।
শুধু বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে বাংলাদেশে জোড়া লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সফল রপ্তানি ব্যবসা গড়ে তোলা কঠিন। প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হলে স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন, দক্ষ মানবসম্পদ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করতে হবে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্র্যান্ড রিলায়বিলিটি।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোভ আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে এবং অনেক রাইডার তাদের নির্মাণমান ও পারফরম্যান্সের প্রশংসা করছেন, তবুও বৈশ্বিক বাজারে চীনা ব্র্যান্ড নিয়ে কিছু প্রচলিত ধারণা এখনও রয়ে গেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রাইডিং কমিউনিটিতে কভের অফ-রোড সক্ষমতা, ওজন এবং প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা ও বিক্রয়োত্তর সেবা নিয়ে প্রশ্নও দেখা যায়।

বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব কতটা?
যদি KOVE তাদের ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে এর প্রভাব শুধু মোটরসাইকেল শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থানীয় যন্ত্রাংশ শিল্পের বিকাশ, নতুন কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ একটি ভোক্তা বাজার থেকে ধীরে ধীরে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যেতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোম্পানিটি শুরু থেকেই বড় পরিকল্পনার কথা বলছে। আর বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্পের সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, কয়েক বছর আগে যেসব বিষয় কল্পনা মনে হতো, তার অনেক কিছুই আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কভের রপ্তানি পরিকল্পনাও হয়তো সেই তালিকায় যুক্ত হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, KOVE কি সত্যিই বাংলাদেশকে তাদের বৈশ্বিক উৎপাদন ও রপ্তানি নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে, নাকি এই ঘোষণা কেবল একটি উচ্চাভিলাষী ব্যবসায়িক স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে।
বাইক বিষয়ক সকল তথ্য ও আপডেট এর জন্য বাইকবিডির সাথেই থাকুন।
তথ্যসুত্রঃ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড




























Discussion 8 Comments