বাংলাদেশে বর্তমানে যানজট, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন খরচ, সবকিছু মিলিয়ে বিকল্প পরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই। তার উপর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীতেই জ্বালানী তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইলেকট্রিক বাইক এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
কিন্তু প্রশ্ন এখনো থেকে যায়, বাংলাদেশে ইলেকট্রিক বাইক কেনা কি বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত? আজকের লেখায় আমরা নির্দিষ্ট কোন ইলেক্ট্রিক বাইকের ফিচার বা দাম নয় বরং বাস্তব ব্যবহার, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সবকিছু নিয়ে আলোচনা করব।


ইলেকট্রিক বাইক ও সিটি কম্যুটিং
রাজধানী ঢাকার হিসাব যদি চিন্তা করা যায় তবে দেখা যায় প্রতিদিনের কমিউটিং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই ধরনের ব্যবহারের জন্য ইলেকট্রিক বাইক একটি ভাল বিকল্প হতে পারে। ইভি গুলোতে পেট্রোল বা অকটেন লাগে না, চার্জ দিলেই চলে এবং মেইন্টেইনেন্স খরচ অনেক কম।
একই সাথে ইলেকট্রিক বাইকের শব্দহীন স্মুথ রাইডিং অভিজ্ঞতা শহরের ট্রাফিকে আলাদা স্বস্তি দেয়। নিয়মিত শব্দ দূষণ এবং আইডল আরপিএম এর ভাইব্রেশনের মধ্যে থাকতে থাকতে এই বিষয়টি এখন অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
খরচের হিসাব কেমন?
ইলেকট্রিক বাইকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে কম খরচ। একটি আইস ইঞ্জিন (গ্যাসলিন) বাইক চালাতে মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খরচ গুনতে হয় যা কারই অজানা না। সেখানে ইলেকট্রিক বাইক চালাতে চার্জিং খরচ খুবই কম। ফুল চার্জে একটি ইলেক্ট্রিক বাইক মাত্র ১৩-১৫ টাকার বিদ্যুৎ ব্যাবহার করে। যেহেতু প্রতিদিন ফুল চার্জ করার প্রয়োজন পড়েনা তাই দৈনিক ব্যবহার অনুযায়ী এই খরচ প্রায় নগণ্য পর্যায়ে থাকে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মাথায় রাখা উচিত, তা হচ্ছে বাইকের ব্যাটারি। বেশিরভাগ ইলেকট্রিক বাইকের ব্যাটারি ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে পরিবর্তন করতে হয়। ব্র্যান্ড ভেদে ব্যাটারি রিপ্লেসমেন্টের খরচ বেশ বড় অঙ্কের হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদের হিসাব করলে এই বিষয়টি একেবারে উপেক্ষা করা যায় না।

পারফরম্যান্স ও সীমাবদ্ধতা
ইলেকট্রিক বাইকের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে স্পিড এবং রেঞ্জ। সাধারণত ইলেক্ট্রিক বাইকগুলো ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। শহরে চলাচলের জন্য এই গতি যথেষ্ট বলা যায়। কিন্তু যারা নিয়মিত হাইওয়েতে চলাচল করেন বা দ্রুত গতিতে বাইক চালানোর অভ্যাস আছে তাদের জন্য এটি সন্তোষজনক নাও হতে পারে। রেঞ্জের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ব্যাটারি পুরনো হয়ে গেলে ইলেক্ট্রিক বাইক থেকে কাঙ্খিত রেঞ্জ পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।
চার্জিং অবকাঠামো: বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে এখনো পাবলিক চার্জিং স্টেশন তেমন গড়ে ওঠেনি। ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে সীমিত আকারে কিছু চার্জিং স্টেশন থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। যার ফলে লম্বা দূরত্বে ইলেক্ট্রিক বাইক নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর। তবে সুবিধা হচ্ছে ব্যবহারকারীরা বাসার সাধারণ ২ পিন সকেট থেকেও চার্জ করতে পারেন খুবই সহজে।
কিন্তু যে কথাটি না বললেই নয় সেটি হচ্ছে চার্জিং এর জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। একটি ইলেক্ট্রিক বাইক চার্জ হতে সাধারণত ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা বা তার ও বেশি সময় লাগে। তাই ওভার নাইট চার্জিং এর পরিকল্পনা করে ইলেক্ট্রিক বাইক ব্যবহার করতে হয়।
সার্ভিস ও নির্ভরযোগ্যতা
ইলেকট্রিক বাইকের বাজার বাংলাদেশে এখনো বিকাশমান। কিন্তু ভাল ব্যাপার হচ্ছে সার্ভিস ও নির্ভরযোগ্যতার দিকে মানুষের আস্থা আনার জন্য ব্র্যান্ড গুলো নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। হোম সার্ভিসিং ফ্যাসিলিটি সহ স্পেয়ার পার্টস এর সহজলভ্যতা এবং তেমন কোন স্পেয়ার পার্টস এর প্রয়োজন না পড়ার কারনে এই দিকে একজন গ্রাহক ঝামেলামুক্ত থাকতে পারছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ইলেকট্রিক বাইকের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে উজ্জ্বল তা বলতেই হবে। কারন বিশ্বজুড়ে যেমন ইলেকট্রিক ভেহিকেলের দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, তেমনি বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন আসছে। সরকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এই সেক্টরে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। সময়ের সাথে সাথে চার্জিং অবকাঠামো, ব্যাটারির দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং সার্ভিস নেটওয়ার্ক আরো উন্নত হলে ইলেকট্রিক বাইক আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে তা বলাই যায়।
সবকিছু বিবেচনা করে বাংলাদেশে ইলেকট্রিক বাইক কেনা “একদম সঠিক সিদ্ধান্ত” নাকি “একদম ভুল সিদ্ধান্ত” এধরনের উত্তর দেওয়া অনুচিত। এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার দৈনন্দিন ব্যবহারের ধরন এবং প্রয়োজনের উপর।
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শীঘ্রই ইলেক্ট্রিক বাইকের ব্যাপক ব্যাবহার বাংলাদেশেও শুরু হবে- বর্তমান পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দেয়। যদি আপনার দৈনন্দিন যাতায়াত শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়, যাতায়াত ও মেইন্টেইনেন্স খরচ কমাতে চান ও জ্বালানী তেলের লাইনে দাঁড়ানোর হয়রানি না পোহাতে চান তাহলে ইলেকট্রিক বাইক অবশ্যই বিকল্প হিসেবে একটি স্মার্ট সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বাইক বিষয়ক সকল তথ্যের জন্য বাইকবিডির সাথেই থাকুন।




























Discussion 8 Comments