বাংলাদেশে বেশ কিছু চাইনিজ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডের অকাল পতন - কারণ ও প্রতিকার

This page was last updated on 15-Jan-2026 10:16am , By Badhan Roy

বাংলাদেশের বাজারে জাপানিজ ও ইন্ডিয়ান মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডগুলোর সাথে সাথে চাইনিজ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড গুলোরও বেশ ভালো পরিমাণ উপস্থিতি কিন্তু লক্ষ করা যায়। তুলনামূলক কমদামি এবং ভাল লুক সহ দাম অনুযায়ী রিজনেবল পারফরম্যান্স দেওয়ায় আমাদের বাইকারদের অনেকেই চাইনিজ ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল গুলোর প্রতি ঝুঁকছেন ও লম্বা সময় ধরে ব্যবহার করছেন। 

কিন্তু তারপরেও দেখা যাচ্ছে অনেক চাইনিজ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড বাংলাদেশের বাজারে শুরুর দিকে বেশ ভাল ব্যাবসা করলেও পরবর্তীতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর বিভিন্ন কারনে এই বাইকগুলো গ্রাহকদের গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে। হাউজিউট্যারো, জনটেস, কিওয়ে, বেনেলি, বেনেট, মেগেলি, বিটল বোল্ট সহ ইত্যাদি অনেক ব্র্যান্ড অকালে হারিয়ে গেছে এবং আরো অনেক ব্র্যান্ড ঝুঁকিতে আছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। 

আজ আমরা জানার চেষ্টা করব বাংলাদেশের চাইনিজ ব্র্যান্ড গুলোর অকাল পতনের কারন এবং তার প্রতিকার কি হতে পারে।

 চাইনিজ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডের অকাল পতন - কারণ

চাইনিজ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডের অকাল পতন - কারণ


১) আস্থার কমতি: এখনো পর্যন্ত আমাদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা বা প্রবাদ প্রচলিত আছে সেটি হচ্ছে “চায়না বেশিদিন যায়না।” একটা সময় ছিল বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন যে কোন চাইনিজ প্রোডাক্টের মান ও স্থায়িত্ব ছিল খুবই খারাপ। যার কারনে এখনো বাংলাদেশের ব্যাবহারকারীদের মধ্যে চায়নিজ ব্র্যান্ড ব্যাবহারের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বাজারে প্রতিদ্বন্দিতার দিক দিয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকা ব্র্যান্ডগুলোর মুখ থুবড়ে পড়ার এটি অন্যতম একটি কারন। 

২) সার্ভিসিং ও স্পেয়ার পার্টস সংকট: চায়নিজ ব্র্যান্ড গুলো হারিয়ে যাওয়ার পিছনে সবচেয়ে বেশি যে কারনটি দায়ী সেটি হচ্ছে সার্ভিসিং ও স্পেয়ার পার্টস এর পর্যাপ্ত সাপোর্ট নিশ্চিত করতে না পারা। সাধারণ ভাবেই একটা বাইক ক্রয় বা বিক্রয় করা হয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বরং নিয়মিত সার্ভিস এবং স্পেয়ার পার্টস প্রয়োজন বাইকটি ভালভাবে চালাতে গেলে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য অধিকাংশ চাইনিজ ব্র্যান্ড ই সার্ভিসিং ও স্পেয়ার পার্টস এভেইলেবেলিটির বিষয়ে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। এই কারনে বহু মানুষ এখন পর্যন্ত মোটামোটি প্রতিষ্ঠিত চাইনিজ ব্র্যান্ডগুলোর বাইক কিনতে গেলেও দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য হন। 

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে সকল মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডের দাম

৩) রিসেল ভ্যালু: বাংলাদেশের বাইক মার্কেট অনুযায়ী চাইনিজ বাইকগুলোর রিসেল ভ্যালু খুবই কম। ফলে একজন গ্রাহক যখন তার বর্তমান বাইক আপডেট করতে চান তিনি আশানুরুপ মূল্য পান না। যার কারনে চাইনিজ ব্র্যান্ড গুলো এখনো যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। 

৪) খারাপ বিল্ড কোয়ালিটি ও টেকসই না হওয়া: বেশ কিছু চাইনিজ ব্র্যান্ডগুলোর বিল্ড কোয়ালিটি ছিল যথেষ্ট বাজে এবং বাইকার তথা ব্যাবহারকারীদের মধ্যে প্রচুর সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। এর পাশাপাশি দেখা গিয়েছিল নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে সুন্দর এগ্রেসিভ লুকিং এর বাইক কিনে ফেললেও অল্প দিনেই বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি রাইডিং এক্সপিরিয়েন্স ছিল খুবই খারাপ। এইজন্যেই বেনেট ও মেগেলির মত ব্র্যান্ড গুলো মূলত মুখ থুবড়ে পড়ে। 

৫) ব্র্যান্ড ভ্যালু ও বাইকার কানেক্টিভিটি: বাংলাদেশে ভারতীয় ও জাপানিজ ব্র্যান্ডগুলোর তুলনায় চাইনিজ ব্র্যান্ড ভ্যালু স্বাভাবিকভাবেই কম। পাশাপশি বাইকার কানেক্টিভিটি ও প্রোডাক্ট মার্কেটিং এর দিকে সঠিক পদক্ষেপ না থাকায় ক্রেতাগণ ঝুকি না নিয়ে ভারতীয় বা জাপানিজ ব্র্যান্ডগুলোর দিকে ঝোকেন। এই কারনে অনেক ব্র্যান্ড ভাল ভাল বাইক আনা স্বত্তেও বাজারে টিকে থাকতে পারে নি। 

কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে চাইনিজ ব্র্যান্ডগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে? 

বর্তমানে যে প্রতিযোগিতামূলক বাজার চলছে তাতে চাইনিজ ব্র্যান্ডগুলো চাইলেই সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এজন্য সর্বপ্রথম তাদের প্রোডাক্টগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করে যথাযথ QC এনশিওর করে আমদানী বা তৈরী করতে হবে। এরপর সব থেকে জরুরি যে জিনিস সেটি হচ্ছে আফটার সেলস সার্ভিস অর্থাৎ সার্ভিসিং ও স্পেয়ার পার্টস এর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে দেশের সর্বত্র।

এক্ষেত্রে চাইনিজ ব্র্যান্ডগুলো নির্দিষ্ট ফিল্ড অফিসার নিয়োগ করে মোটর পার্টসের দোকান গুলোতে তাদের স্পেয়ার পার্টস গুলোর তথ্য এবং প্রচারণা চালিয়ে বিক্রেতার আগ্রহ ও আকৃষ্ট করতে পারেন। এছাড়াও প্রতিটি জেলায় না হলেও অন্তত অঞ্চলভিত্তিক পর্যাপ্ত সার্ভিসিং সেন্টার ও দক্ষ টেকনিশিয়ান নিয়োগ করা অত্যাবশ্যক। 

ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং বাইকার কানেক্টেভিটি বাড়াতে চাইলে বিভিন্ন এমন ধরণের এক্টিভিটি আয়োজন করতে হবে যেখান থেকে বাইকার রা সরাসরি তাদের ব্র্যান্ডের বাইক এবং তাদের আফটার সেলস সার্ভিস সম্পর্কে সরাসরি নিজেরা জানতে ও টেস্ট রাইড দিয়ে বাইকগুলোর রাইডিং ফিডব্যাক নিতে পারেন। এতে করে তাদের ব্র্যান্ডের পরিচিতি যেমন বাড়বে ক্রেতাসাধারণ সরাসরি নিজেরা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বাইক ব্র্যান্ড গুলো ব্যাবহারের প্রতি। 

পরিশেষে বলা যায়, “চায়না বেশিদিন যায়না” – এই ধরণের প্রবাদ কিন্তু চাইলেই চাইনিজ ব্র্যান্ড গুলো ভুল প্রমাণ করতে পারে। চাইনিজ বাইক গুলোও যে অনেক ভাল সেবা দিতে পারে এবং তাদের প্রোডাক্ট কোয়ালিটি অনেক ভাল হতে পারে তার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ CFMOTO এবং Lifan.

ব্র্যান্ডগুলো তারা তাদের বাইকের কোয়ালিটি অনেক ভাল করার পাশাপাশি কম বেশি সারা দেশে না হলেও অধিকাংশ অঞ্চলে ইতিমধ্যেই তাদের স্পেয়ার পার্টস এবং সার্ভিসিং সেবাটি পৌছে দিয়েছে ও গ্রাহকদের সন্তুষ্টি অর্জন করেছে। আমরা আশাবাদী, অন্যান্য চাইনিজ কোম্পানিগুলোও এই ব্র্যান্ডগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং আরো প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরী করে বাইকারদের জন্য যৌক্তিক মূল্যে ভাল ভাল বাইক তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করবে।

 

বাইক বিষয়ক সকল তথ্য ও আপডেটের জন্য বাইকবিডির সাথেই থাকুন।